ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধি ও স্কিনারের শিখন তত্ত্বের বিশ্লেষণ

ব্যক্তিত্বের সংজ্ঞা ও নির্ধারকসমূহ

ভূমিকা: ব্যক্তিত্ব (Personality) হলো একজন মানুষের শারীরিক, মানসিক, আবেগীয়, সামাজিক ও নৈতিক বৈশিষ্ট্যের সমষ্টি। ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে একজন মানুষ অন্যদের থেকে আলাদা হয়ে ওঠে। ব্যক্তিত্ব গঠনে প্রধানত দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ— বংশগতি এবং পরিবেশ।

ব্যক্তিত্বের সংজ্ঞা

ব্যক্তির এমন স্থায়ী শারীরিক, মানসিক, আবেগীয় ও আচরণগত বৈশিষ্ট্যের সমষ্টি, যার দ্বারা তাকে অন্যদের থেকে পৃথকভাবে চিহ্নিত করা যায়, তাকে ব্যক্তিত্ব বলে।

ব্যক্তিত্বের নির্ধারক হিসেবে বংশগতির ভূমিকা

  • বংশগতির মাধ্যমে শারীরিক গঠন, উচ্চতা, গায়ের রং ইত্যাদি নির্ধারিত হয়।
  • বুদ্ধিমত্তা, স্মৃতিশক্তি ও মানসিক সক্ষমতার উপর বংশগতির প্রভাব থাকে।
  • মেজাজ ও স্বভাবের কিছু বৈশিষ্ট্য জন্মগতভাবে আসে।
  • কিছু বিশেষ প্রতিভা ও দক্ষতা বংশগতির মাধ্যমে পাওয়া যায়।
  • শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ভিত্তিও অনেকাংশে বংশগতির উপর নির্ভর করে।

ব্যক্তিত্বের নির্ধারক হিসেবে পরিবেশের ভূমিকা

  • পরিবার শিশুর ব্যক্তিত্ব গঠনের প্রথম ও প্রধান পরিবেশ।
  • বিদ্যালয় শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও সামাজিক আচরণ শেখায়।
  • বন্ধু ও সহপাঠীদের প্রভাব ব্যক্তিত্বের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ।
  • সমাজ ও সংস্কৃতি মানুষের মূল্যবোধ ও আচরণ গঠন করে।
  • অর্থনৈতিক অবস্থা, শিক্ষা, গণমাধ্যম ও সামাজিক অভিজ্ঞতা ব্যক্তিত্বকে প্রভাবিত করে।

উপসংহার

ব্যক্তিত্ব গঠনে বংশগতি ও পরিবেশ উভয়েরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বংশগতি ব্যক্তিত্বের ভিত্তি তৈরি করে, আর পরিবেশ সেই ভিত্তিকে বিকশিত ও পরিপূর্ণ করে। তাই ব্যক্তিত্বের পূর্ণাঙ্গ বিকাশের জন্য বংশগতি ও পরিবেশ—দুটিই সমানভাবে প্রয়োজনীয়।


বুদ্ধির সংজ্ঞা ও থার্স্টোনের দলগত উপাদান তত্ত্ব

ভূমিকা: শিক্ষার মনোবিজ্ঞানে বুদ্ধি (Intelligence) এমন একটি মানসিক ক্ষমতা, যার সাহায্যে মানুষ শেখে, যুক্তি করে, সমস্যা সমাধান করে এবং নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে।

বুদ্ধির সংজ্ঞা

মনোবিজ্ঞানী ডেভিড ওয়েচসলার (Wechsler)-এর মতে, “বুদ্ধি হলো উদ্দেশ্যমূলকভাবে কাজ করার, যুক্তিসঙ্গতভাবে চিন্তা করার এবং পরিবেশের সঙ্গে কার্যকরভাবে মানিয়ে নেওয়ার সামগ্রিক মানসিক ক্ষমতা।”

থার্স্টোনের দলগত উপাদান তত্ত্ব (SOL Model)

মনোবিজ্ঞানী এল. এল. থার্স্টোন (L. L. Thurstone) মনে করেন, বুদ্ধি কোনো একক শক্তি নয়। এটি কয়েকটি প্রাথমিক মানসিক ক্ষমতা (Primary Mental Abilities) নিয়ে গঠিত। তিনি সাতটি প্রধান মানসিক ক্ষমতার কথা বলেন—
  1. Verbal Comprehension (শব্দ বোঝার ক্ষমতা): ভাষা বুঝতে ও ব্যবহার করতে পারা।
  2. Word Fluency (শব্দপ্রবাহ): দ্রুত ও সঠিকভাবে শব্দ ব্যবহার করার ক্ষমতা।
  3. Number Ability (সংখ্যাগত ক্ষমতা): অঙ্ক ও হিসাব করার দক্ষতা।
  4. Spatial Ability (স্থানগত ক্ষমতা): আকার, দিক ও অবস্থান বুঝতে পারা।
  5. Associative Memory (স্মৃতিশক্তি): তথ্য মনে রাখা ও প্রয়োজনে স্মরণ করার ক্ষমতা।
  6. Perceptual Speed (উপলব্ধির গতি): দ্রুত মিল-অমিল শনাক্ত করার ক্ষমতা।
  7. Reasoning (যুক্তি করার ক্ষমতা): সমস্যা বিশ্লেষণ ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।

শিক্ষাক্ষেত্রে গুরুত্ব

  • শিক্ষার্থীর বিভিন্ন ধরনের দক্ষতা মূল্যায়নে সাহায্য করে।
  • প্রত্যেক শিক্ষার্থীর শক্তি ও দুর্বলতা চিহ্নিত করা যায়।
  • উপযুক্ত শিক্ষণ-পদ্ধতি নির্বাচন করতে সুবিধা হয়।
  • ব্যক্তিভেদে শিক্ষা পরিকল্পনা করা সম্ভব হয়।

উপসংহার

থার্স্টোনের মতে, বুদ্ধি একক নয়; বরং বিভিন্ন প্রাথমিক মানসিক ক্ষমতার সমন্বয়ে গঠিত। তাই শিক্ষার্থীর বুদ্ধির সঠিক মূল্যায়নের জন্য এই সব ক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।


স্কিনারের সক্রিয় অনুবর্তন তত্ত্ব ও শিক্ষাগত তাৎপর্য

ভূমিকা: আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী B. F. Skinner আচরণবাদী মতবাদের অন্যতম প্রবক্তা। তিনি সক্রিয় অনুবর্তন তত্ত্ব (Operant Conditioning Theory) প্রবর্তন করেন। তাঁর মতে, জীব কোনো কাজ করার পর যদি পুরস্কার পায়, তবে সেই কাজ পুনরায় করার সম্ভাবনা বেড়ে যায়; আর শাস্তি পেলে সেই আচরণের পুনরাবৃত্তি কমে যায়।

স্কিনারের সক্রিয় অনুবর্তন তত্ত্ব

স্কিনার পরীক্ষার জন্য একটি Skinner Box ব্যবহার করেন। এতে একটি ক্ষুধার্ত ইঁদুর রাখা হয়। বাক্সের ভিতরে একটি লিভার ছিল। প্রথমে ইঁদুরটি এদিক-ওদিক ঘুরতে থাকে। হঠাৎ লিভারে চাপ পড়লে খাদ্য বেরিয়ে আসে। কয়েকবার এমন হওয়ার পরে ইঁদুরটি বুঝতে শেখে যে লিভারে চাপ দিলেই খাবার পাওয়া যায়। ফলে সে বারবার লিভারে চাপ দেয়। এভাবেই পুরস্কারের মাধ্যমে একটি নতুন আচরণ শেখা হয়। এই শেখাকেই সক্রিয় অনুবর্তন বলা হয়।
স্কিনারের মতে—
  • পুনর্বলন (Reinforcement): আচরণকে শক্তিশালী করে।
  • ইতিবাচক পুনর্বলন (Positive Reinforcement): ভালো কাজের জন্য পুরস্কার দেওয়া।
  • নেতিবাচক পুনর্বলন (Negative Reinforcement): অপ্রিয় অবস্থা দূর করে কাঙ্ক্ষিত আচরণ বৃদ্ধি করা।
  • শাস্তি (Punishment): অবাঞ্ছিত আচরণ কমায়।

শিক্ষাগত তাৎপর্য

  • ভালো কাজের জন্য প্রশংসা ও পুরস্কার দিলে শেখার আগ্রহ বাড়ে।
  • শিক্ষার্থীদের সঠিক আচরণ গড়ে তুলতে পুনর্বলন কার্যকর।
  • জটিল বিষয়কে ধাপে ধাপে শেখানো সহজ হয়।
  • প্রোগ্রামভিত্তিক শিক্ষা (Programmed Learning)-এর ভিত্তি এই তত্ত্ব।
  • শ্রেণিকক্ষে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সহায়ক।
  • শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস ও অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায়।

উপসংহার

স্কিনারের সক্রিয় অনুবর্তন তত্ত্ব আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যথাযথ পুনর্বলনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর শেখা, অভ্যাস গঠন এবং ইতিবাচক আচরণ বিকাশ সহজ ও কার্যকর হয়।