প্রাচীন ভারতের ইতিহাস: হরপ্পা থেকে মৌর্য যুগ পর্যন্ত

১. হরপ্পান লিপি (Harappan Script)

হরপ্পান বা সিন্ধু লিপি হলো প্রাচীন ভারতের অন্যতম রহস্যময় লিপি। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

  • চিত্রলিপি: এই লিপি মূলত পিক্টোগ্রাফিক বা চিত্রলিপি, যেখানে চিহ্ন এবং ছবির মাধ্যমে ভাব প্রকাশ করা হতো।
  • লিখন পদ্ধতি: এটি সাধারণত ডান দিক থেকে বাম দিকে লেখা হতো (যাকে ‘বুস্ট্রফেডন’ পদ্ধতি বলা হয়)।
  • পাঠোদ্ধার: আশ্চর্যের বিষয় হলো, আজ পর্যন্ত এই লিপির সার্থক পাঠোদ্ধার সম্ভব হয়নি। এই লিপিতে প্রায় ৪০০ থেকে ৬০০টি মৌলিক চিহ্ন আবিষ্কৃত হয়েছে।

২. বৈদিক যুগে ‘সভা’ ও ‘সমিতি’র কার্যাবলি

ঋগ্বৈদিক যুগে রাজতন্ত্র থাকলেও রাজার ক্ষমতা নিরঙ্কুশ ছিল না। জনমত গঠনের জন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ পরিষদ ছিল:

  • সভা: এটি ছিল মূলত বয়োজ্যেষ্ঠ এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত একটি ক্ষুদ্র পরিষদ। এটি বিচারকার্য এবং প্রশাসনিক পরামর্শ দেওয়ার কাজ করত।
  • সমিতি: এটি ছিল সাধারণ মানুষের একটি বৃহৎ সমাবেশ। এখানে রাজনৈতিক আলোচনা ছাড়াও রাজা নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। গণতান্ত্রিক কাঠামোর প্রাথমিক রূপ হিসেবে এই দুটি প্রতিষ্ঠান কাজ করত।

৩. বৌদ্ধধর্মে ‘মধ্যপন্থা’ (Middle Path)

গৌতম বুদ্ধ নির্বাণ লাভের জন্য যে জীবনদর্শনের কথা বলেছেন, তাকেই বলা হয় মধ্যপন্থা বা ‘মজ্ঝিম পটিপদা’।

  • চরমপন্থা বর্জন: এর অর্থ হলো—অতিরিক্ত বিলাসিতা এবং কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন বা শরীরকে কষ্ট দেওয়া, এই দুইয়ের কোনোটিই সঠিক নয়।
  • অষ্টাঙ্গিক মার্গ: বুদ্ধের মতে, মানুষের উচিত মাঝখানের পথ অনুসরণ করা। এই আদর্শই বৌদ্ধধর্মের মূল ভিত্তি, যা পালনের জন্য তিনি ‘অষ্টাঙ্গিক মার্গ’-এর পথ দেখিয়েছেন।

৪. অর্থশাস্ত্র (Arthasastra)

মৌর্য যুগের ইতিহাস ও রাজনীতি জানার প্রধান উৎস হলো কৌটিল্য (বা চাণক্য) রচিত ‘অর্থশাস্ত্র’।

  • বিষয়বস্তু: এটি মূলত রাষ্ট্রনীতি, কূটনীতি, অর্থনীতি এবং সামরিক প্রশাসন সংক্রান্ত একটি আকর গ্রন্থ।
  • সপ্তাঙ্গ তত্ত্ব: এখানে আদর্শ রাষ্ট্রের সাতটি অঙ্গের কথা বলা হয়েছে।
  • গুরুত্ব: প্রাচীন ভারতের শাসনব্যবস্থা এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাজার কর্তব্য কী হওয়া উচিত, তার বিস্তারিত বিবরণ এতে পাওয়া যায়। এটি বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক গ্রন্থ হিসেবে পরিচিত।

৫. মধ্যপ্রস্তর যুগের গুহাচিত্র

মধ্যপ্রস্তর যুগে (Mesolithic Age) মানুষের শৈল্পিক চেতনার এক অনন্য প্রকাশ ঘটেছিল গুহাচিত্রের মাধ্যমে। ভারতের ভীমবেটকা (মধ্যপ্রদেশ) এই ধরণের চিত্রকলার প্রধান কেন্দ্র।

  • বিষয়বস্তু: এই সময়ের চিত্রগুলিতে শিকারের দৃশ্য প্রাধান্য পেয়েছে। মানুষ, পশুপাখি, মাছ ধরার দৃশ্য এবং দলবদ্ধ নাচের ছবিও দেখা যায়।
  • রঙের ব্যবহার: প্রধানত লাল এবং সাদা রঙের আধিক্য ছিল, তবে সবুজ ও হলুদের ব্যবহারও চোখে পড়ে। খনিজ পাথর (যেমন হেমাটাইট) ঘষে রঙ তৈরি করা হতো।
  • শৈলী: এই চিত্রগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি গতিশীল এবং রেখাচিত্র নির্ভর। প্রাণীদের শারীরিক গঠন ফুটে তোলার পাশাপাশি মানুষের সামাজিক জীবনের প্রতিফলন এতে দেখা যায়।
  • গুরুত্ব: এই গুহাচিত্রগুলো থেকে তৎকালীন মানুষের খাদ্যাভ্যাস, শিকারের কৌশল এবং আদিম বিশ্বাসের পরিচয় পাওয়া যায়।

৬. মৌর্য ভাস্কর্য ও স্থাপত্য শিল্পের বৈশিষ্ট্য

মৌর্য সম্রাট অশোকের সময়ে শিল্পকলা এক চরম উৎকর্ষ লাভ করে। মৌর্য শিল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

  • অশোক স্তম্ভ: মৌর্য শিল্পের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হলো একশিলা স্তম্ভ বা ‘Monolithic Pillars’। এই স্তম্ভগুলোর উপরিভাগে সিংহ বা ষাঁড়ের মূর্তি থাকত (যেমন: সারনাথের সিংহচক্র)।
  • চমকপ্রদ পালিশ: মৌর্য স্থাপত্যের অন্যতম বিশেষত্ব ছিল পাথরের ওপর দর্পণের মতো এক ধরণের উজ্জ্বল পালিশ (Mauryan Polish), যা আজও বিস্ময় জাগায়।
  • স্তূপ ও গুহা: বৌদ্ধ ধর্মের প্রসারের জন্য সম্রাট অশোক অসংখ্য স্তূপ (যেমন সাঁচি স্তূপ) এবং পাহাড় কেটে গুহা (যেমন বরাবর গুহা) নির্মাণ করেছিলেন।
  • লোকশিল্প: দরবারী শিল্পের পাশাপাশি যক্ষ ও যক্ষিণীর মতো বিশাল আকৃতির পাথরের মূর্তিও এই সময় নির্মিত হয়েছিল, যা তৎকালীন লোকশিল্পের পরিচয় দেয়।

৭. প্রাচীন ভারতের ইতিহাস পুনর্গঠনে শিলালিপির গুরুত্ব

প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে সাহিত্যিক উপাদানের চেয়ে প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান, বিশেষ করে লিপির (Inscriptions) গুরুত্ব অপরিসীম।

  • নির্ভরযোগ্যতা: সাহিত্যের মতো লিপিতে কাল্পনিক কাহিনী বা পরিবর্তন হওয়ার ভয় থাকে না। এটি সমসাময়িক ঘটনার এক পাথুরে প্রমাণ।
  • কালানুক্রমিক তথ্য: লিপি থেকে বিভিন্ন রাজার রাজ্যজয়ের তারিখ, বংশতালিকা এবং রাজ্যাভিষেকের বছর সঠিকভাবে জানা যায়। যেমন—অশোকের শিলালিপি বা সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ প্রশস্তি।
  • প্রশাসনিক ব্যবস্থা: রাজার আদেশ, ভূমিদান এবং শাসন প্রণালী সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায় (যেমন: নাসিক প্রশস্তি)।
  • ভৌগোলিক সীমানা: যে স্থানে লিপিটি পাওয়া যাচ্ছে, তা থেকে সেই সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

৮. খ্রীষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে বৌদ্ধধর্মের উৎপত্তি

খ্রীষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে গঙ্গার মধ্য অববাহিকায় ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিকল্প হিসেবে এক অভিনব ধর্মীয় আন্দোলনের সূচনা হয়, যার অন্যতম প্রধান ছিল বৌদ্ধধর্ম।

  • উৎপত্তি: যজ্ঞের আড়ম্বর, জাতিভেদ প্রথা এবং সাধারণ মানুষের বোধগম্য নয় এমন সংস্কৃত ভাষার পরিবর্তে গৌতম বুদ্ধ সহজ সরল পালি ভাষায় শান্তির বাণী প্রচার করেন। বৈশ্য ও ক্ষত্রিয় শ্রেণী এই নতুন ধর্মকে সমর্থন জোগায়।
  • আদর্শ: বুদ্ধের প্রচারিত ‘চারটি আর্য সত্য’ এবং দুঃখ মুক্তির পথ হিসেবে ‘অষ্টাঙ্গিক মার্গ’ মানুষকে প্রবলভাবে আকৃষ্ট করে।
  • বিকাশ: মগধের রাজা বিম্বিসার, অজাতশত্রু এবং পরবর্তীকালে সম্রাট অশোক ও কণিষ্কের পৃষ্ঠপোষকতায় বৌদ্ধধর্ম ভারতের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে।
  • সঙ্ঘের ভূমিকা: বৌদ্ধ ‘সঙ্ঘ’ এবং ভিক্ষুদের নিয়মানুবর্তিতা এই ধর্মের প্রাতিষ্ঠানিক প্রসারে বড় ভূমিকা পালন করেছিল।

৯. অশোকের ধম্মের মূল নীতি ও বৌদ্ধধর্মের প্রভাব

সম্রাট অশোক কলিঙ্গ যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে যুদ্ধনীতি (ভেঘোষ) ত্যাগ করে ধর্মবিজয়ের (ধম্মঘোষ) নীতি গ্রহণ করেন। তাঁর ‘ধম্ম’ কেবল একটি ধর্মীয় মতবাদ ছিল না, বরং এটি ছিল সামাজিক সংহতি রক্ষার একটি নৈতিক আচরণবিধি।

ধম্মের মূল নীতিসমূহ:

  • অহিংসা: ধম্মের প্রধান স্তম্ভ ছিল অহিংসা। পশুবলি নিষিদ্ধ করা এবং অকারণে প্রাণীহত্যা বন্ধ করার ওপর তিনি জোর দিয়েছিলেন।
  • পিতা-মাতার প্রতি ভক্তি: গুরুজন, শিক্ষক এবং পিতা-মাতাকে শ্রদ্ধা করা এবং তাঁদের আজ্ঞা পালন করা ছিল ধম্মের অন্যতম নীতি।
  • সামাজিক সহনশীলতা: দাস ও ভৃত্যদের প্রতি দয়া প্রদর্শন এবং সকল ধর্মের মানুষের প্রতি সহনশীল হওয়া ও পরধর্মসহিষ্ণুতা বজায় রাখা।
  • দানশীলতা: দরিদ্র ও ব্রাহ্মণদের দান করা এবং জনকল্যাণমূলক কাজ করা।
  • আত্মসংযম: ক্রোধ, নিষ্ঠুরতা, ঈর্ষা ও অহংকার ত্যাগ করে পবিত্র জীবনযাপন করা।

বৌদ্ধধর্মের প্রভাব:

  • সাদৃশ্য: বৌদ্ধধর্মের ‘পঞ্চশীল’ নীতির অনেক কিছুই ধম্মের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
  • পার্থক্য: বৌদ্ধধর্মের মূল লক্ষ্য ছিল ‘নির্বাণ’ লাভ, কিন্তু অশোকের ধম্মের লক্ষ্য ছিল ইহলোকে শান্তি এবং পরলোকে স্বর্গলাভ।
  • সার্বজনীনতা: অশোকের ধম্ম ছিল বৌদ্ধধর্মের একটি ব্যবহারিক ও নৈতিক রূপ, যা সব ধর্মের মানুষ পালন করতে পারত।

১০. হরপ্পা সভ্যতার নগর পরিকল্পনার বৈশিষ্ট্য

সিন্ধু বা হরপ্পা সভ্যতা বিশ্বের প্রাচীনতম পরিকল্পিত নগর সভ্যতার উদাহরণ।

  • পরিকল্পিত নগর কাঠামো: প্রতিটি শহর দুটি ভাগে বিভক্ত ছিল—একটি উঁচু এলাকা বা ‘সিটাডেল’ (Citadel) এবং নিচু এলাকা বা সাধারণ মানুষের বসবাসের স্থান। রাস্তাগুলি ছিল প্রশস্ত এবং একে অপরকে সমকোণে (৯০°) ছেদ করত।
  • উন্নত পয়ঃপ্রণালী: প্রতিটি বাড়ির নর্দমা রাস্তার মূল নর্দমার সাথে যুক্ত ছিল। নর্দমাগুলি পোড়া ইট দিয়ে ঢাকা থাকত এবং পরিষ্কার করার জন্য নির্দিষ্ট দূরত্বে ‘ম্যানহোল’ ছিল।
  • গৃহনির্মাণ: বাড়িগুলো সাধারণত এক বা একাধিক তলা বিশিষ্ট হতো। বাড়ির মাঝখানে উঠোন থাকত এবং প্রতিটি বাড়িতে আলাদা স্নানাগার ও কুয়ো ছিল।
  • শস্যাগার ও স্নানাগার: মহেঞ্জোদাড়োর বৃহৎ স্নানাগার এবং হরপ্পার বিশাল শস্যাগার তৎকালীন উন্নত প্রকৌশলবিদ্যার পরিচয় দেয়।